ট্রাম্পের জয়ে বিপর্যয়ের মুখে বিশ্বব্যবস্থা

Nov 10, 2016 12:30 pm


ফিলিপ লেগ্রেইন

বলা যায়, ইতিহাসের শেষ এখানেই। ইউরোপে সমাজতন্ত্র ধসে পড়ার পথ দেখানো বার্লিন প্রাচীর পতনের ২৭ বছর পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এটা কিসের ইঙ্গিত? তার নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে উদারমনা পূর্বসূরিরা যে উদার আন্তর্জাতিকব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেটাকেই বিপদগ্রস্ত করে তুলেছে।


ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’, ‘বৈশ্বিক’ বিরোধী এজেন্ডা সংরক্ষণবাদী বাণিজ্যযুদ্ধ, বিশ্বজুড়ে ‘সভ্যতার সঙ্ঘাত’, ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ায় শান্তি এবং সেই সাথে মধ্যপ্রাচ্যে সহিংসতা আরো বাড়িয়ে দেয়ার হুমকি সৃষ্টি করেছে। তার উগ্র স্বাদেশিকতা এবং স্বৈরতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিও অভিন্ন মূল্যবোধ, উদার গণতান্ত্রিক বিশ্বাস এবং বিধিবিধানভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় আমেরিকান প্রাধান্যের ধারণাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আগে থেকেই নাজুক হচ্ছিল, এখন ক্ষুব্ধ পশ্চাদপসরণ হতে পারে।


আশাবাদীরা মনে করছে, নির্বাচনী প্রচারণার সময় যেসব কথা বলেছেন, সেগুলো আসলে ট্রাম্পের কথার কথা। নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি এখন অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিকবাদী উপদেষ্টাদের সাহচর্যে থাকবেন, মার্কিন রাজনৈতিকব্যবস্থাই তাকে সহজাতভাবে ভারসাম্যে রাখবে। এমনটা আশা করা ভালো। কিন্তু তার মনমেজাজ তেমন নয়। রিপাবলিকানরা সিনেট আর প্রতিনিধি পরিষদ উভয়টাতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার প্রেক্ষাপটে পূর্বেকার প্রায় সব প্রেসিডেন্টের চেয়ে তার ক্ষমতা থাকবে অনেক বেশি। বাণিজ্য ও পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বিষয়টি আরো বেশি সত্য। আর এখানেই ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি এবং তা অনেক বেশি সময় স্থায়ী হতে পারে।


বাণিজ্য নিয়েই শুরু করা যাক। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বায়ন স্থবির হয়ে পড়েছিল। এখন ট্রাম্প হুমকি দিচ্ছেন, তিনি পিছু হটবেন। বারাক ওবামার অন্তত দু’টি বিশাল প্রকল্প বড় ধরনের হোঁচট খাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এগুলো হচ্ছে ১১টি প্যাসিফিক দেশকে নিয়ে গড়া ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (টিপিপি)এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সাথে ট্রান্স-আটলান্টিক ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট পার্টনারশিপ (টিটিআইপি)।


ট্রাম্প ইতোমধ্যেই জানিয়েছেন, তিনি নাফতা নিয়ে কানাডা ও মেক্সিকোর সাথে নতুন করে আলোচনা করবেন। সেই সাথে চীনাসামগ্রী আমদানির ওপর নতুন করে কর চাপাবেন। এতে করে বাণিজ্যযুদ্ধ পুরো মাত্রায় শুরু হয়ে যেতে পারে। এমনকি বহুজাতিক বিধিব্যবস্থা সংবলিত বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা থেকেও সরে আসার হুমকি দিয়েছেন।


এ ধরনের এজেন্ডা কেবল বৈশ্বিক মন্দার হুমকিই সৃষ্টি করবে না। অনেক অঞ্চলকে প্রতিদ্বন্দ্বী বাণিজ্যিক ব্লকে সরে যেতেও উৎসাহিত করবে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বের হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে বিষয়টা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরো খারাপ পরিণতি ডেকে আনবে। আবার টিপিপি বাতিল করা হলে তা হবে চীনের জন্য পোয়াবারো। চীন তখন আরো সহজে তার নিজস্ব বাণিজ্য ব্লক তৈরি করে নিতে পারবে।


ট্রাম্পের জয় পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা এবং অর্থনীতিকেও হুমকির মুখে ফেলে দিতে পারে। মুক্ত বাণিজ্য থেকে সরে আসা মানে এই সংশয়ের সৃষ্টি করবে, যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। এর ফলে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং আরো কয়েকটি দেশকে উদীয়মান চীনের বিরুদ্ধে নিজেদের তৈরি করে নিতে পরমাণু অস্ত্র সংগ্রহের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে।ফিলিপাইন এর মধ্যেই দেখিয়ে দিয়েছে, ক্রমবর্ধমান হারে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়া যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করার চেয়ে চীনের সাথে থাকা অনেক ভালো। ফিলিপাইনের দেখানো পথটি আরো অনেক দেশ অনুসরণ করতে পারে।


ট্রাম্পের জয় ইউরোপের নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। তার মুখ থেকে রাশিয়ার একনায়ক ভøাদিমির পুতিনের প্রশংসা খুবই আতঙ্কের বিষয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙে যাওয়ায় পুতিন এখনো যন্ত্রণাকাতর। তিনি চান আবারো রাশিয়া প্রভাবিত একটি অঞ্চল গড়ে তুলতে। জর্জিয়া আর ইউক্রেন আক্রমণ সেই লক্ষ্যেই চালিত হয়েছিল। ট্রাম্প জানিয়েছেন, ন্যাটো সদস্যদেশগুলোকে আনুপাতিক ব্যয় বহন করতে হবে। এর মানে পুতিনকে তার মিশনে আরো উদ্বুদ্ধ করা।


লাতভিয়া, লিথুয়ানিয়ার মতো বাল্টিক অঞ্চলের দেশগুলো একসময় সোভিয়েত ইউনিয়নে ছিল। ন্যাটোভুক্ত এসব দেশে এখনো বিপুল সংখ্যায় রুশ সংখ্যালঘু বাস করে। ফলে এসব দেশ বেশ ঝুঁকিতে থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা কমে গেলে এসব দেশ একদিকে নিজদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াবে, অন্যদিকে ইউরোপিয়ান ব্লকেও তেমনভাবে থাকতে রাজি হবে না। এর ফলে অনেক দেশ পুতিনের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে।


আমেরিকা নিজ দেশেও সমস্যায় পড়বে। তার খোলামেলা বর্ণবাদিতা, হিসপানিক অভিবাসীদের প্রতি বৈরিতা এবং ইসলাম সম্পর্কে বিরূপ ধারণা দেশটির মধ্যে সাংস্কৃতিক সঙ্ঘাত সৃষ্টি করতে পারে। স্যামুয়েল হান্টিংটনের ‘ক্লাস অব সিভিলাইজেশনের’ উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে সহজেই। সীমান্তে বিশাল প্রাচীর নির্মাণ করতে মেক্সিকোকে বাধ্য করা হলে তা সব ল্যাতিনোর মধ্যে বৈরিতার সৃষ্টি হবে। নির্বাচনী প্রচারণার সময় তিনি বলেছিলেন, মুসলমানদের তিনি যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে দেবেন না। তিনি এই ঘোষণা বাস্তবে পরিণত করলে তা আলকায়েদা এবং আইএসের জন্য বেশ সুবিধাজনক হবে। তাদের আর দল ভারী করতে কষ্ট করতে হবে না। আবার তিনি ইরাকের তেল ক্ষেত্রগুলো দখল করার যে হুমকি দিয়েছেন, সেটাও ক্ষোভের আগুন জ্বালাবে।


সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে আমেরিকার ‘সফট পাওয়ার’ এবং এর উদারমনা গণতন্ত্র। একজন বর্ণবাদীকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করা মানে আমেরিকার রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে অভিযুক্ত করে ফেলা। ট্রাম্প এর মধ্যেই প্রমাণ করেছেন, তিনি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নন। প্রমাণ? তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তিনি হেরে গেলে ফলাফল মেনে নেবেন না। তা ছাড়া তিনি তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে জেলে ভরার হুমকিও দিয়েছিলেন।


এস্টাবলিশমেন্টবিরোধী বিদ্রোহীরা প্রবল উৎসাহে এগিয়ে যাবে। আর্থিক সঙ্কট আর অর্থনৈতিক পালাবদলের জটিলতায় অনেক ভোটারই এখন পাশ্চাত্যের এলিটদের ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়েছে। তারা এখন এলিটদের বিবেচনা করছে অথর্ব, দুর্নীতিগ্রস্ত এবং ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা শ্রেণী। তাদের অনেকে অভিবাসীদেরই তাদের সমস্যার মূল কারণ মনে করে। তারা সামাজিক উদারবাদকেও প্রতিকূল মনে করে।


এমন এক প্রেক্ষাপটে এবং ইতিবাচক বিকল্পের অভাবে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে যেতে পারে। আর এখন যদি ফ্রান্সের আগামী নির্বাচনে উগ্রপন্থী ম্যারি লে পেন জয়ী হয়ে যান, তবে অবস্থা কী হবে। সেটা হবে সম্ভবত ইউরো, ইইউ এবং পাশ্চাত্যকে উড়িয়ে দেয়ার একটি ঘটনা।
উদারমনা আন্তর্জাতিকবাদীরা এমন অবস্থায় টিকে থাকতে পারবেন না। অর্থাৎ ট্রাম্পের জয় একটি বিপর্যয়। এমনকি পরিস্থিতি যতটুকু অনুমান করা যাচ্ছে, তার চেয়েও খারাপ হবে। এখন উদ্বিগ্ন ভোটারদের ধরে রাখতে আমাদের প্রয়োজন নিজেদের রক্ষা করা এবং ইতিবাচক পরিবর্তনের ধারণা দেয়া।

লেখক : ইউরোপিয়ান কমিশনের সভাপতির সাবেক অর্থনৈতিক উপদেষ্টা। তিনি লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের সিনিয়র ফেলো।

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ


 

[X]