ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্য সঙ্কটের মোকাবেলায় ব্যর্থ হবেন

Nov 10, 2016 12:23 pm


রবার্ট ফিস্ক
অবশ্যই মধ্যপ্রাচ্যে কোনো পরিবর্তন আসবে না। ট্রাম্প মুসলিম অভিবাসীদের প্রসঙ্গে ননসেন্সের মতো উক্তি করেছেন। তবুও একটি বিষয় সব সময়ে হিলারি ক্লিনটন ও ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এক করেছে। তা হলো আলজেরিয়া ও ভারত-পাকিস্তান সীমান্তের মধ্যবর্তী বিস্তীর্ণ অঞ্চল। নাকি মরক্কো আর পাক-ভারত সীমান্তের মধ্যবর্তী অঞ্চল? নাকি ইরান-পাকিস্তান সীমান্ত? খোদাই জানেন, আমেরিকার রাজনীতিকদের মনে অথবা ট্রাম্পের মনে ‘মধ্যপ্রাচ্য’ আসলে কোথায় অবস্থিত?


ধারণা করছি, এটা ইহুদি অধ্যুষিত ইসরাইলের পাশে অবস্থিত, মুসলমানদের একটি ‘বিরাট পুকুর’। এই মধ্যপ্রাচ্যে কিছু খ্রিষ্টানও আছে। যখন তাদের গির্জা পোড়ানো হতো এবং তাদের লোকজনকে বানানো হয় দাস, তখন এই খ্রিষ্টানদের কথা আপনার মনে পড়ে। অনেক আগে ইউরোপকে বলা হতো ‘খ্রিষ্টানদের রাজ্য’। পাশ্চাত্যে আমরাও নিজেদের খ্রিষ্টান বলে পরিচয় দিতাম।


ট্রাম্পের ‘মধ্যপ্রাচ্য’ অনেকটা তেমনই হবে, হিলারির ‘মধ্যপ্রাচ্য’ যেমন হতো। পারমাণবিক শক্তিধর ইসরাইলের প্রতি নিরঙ্কুশ সমর্থন, তেমনি এর বিভ্রান্ত ও বিশৃঙ্খল প্রধানমন্ত্রীর প্রতি সমর্থন জোগানো, নিরর্থক অবিরাম সন্ত্রাস, সন্ত্রাস, সন্ত্রাস, সন্ত্রাস আর সন্ত্রাস (আপনি এই শব্দটি নিয়ে হয়রান হয়ে গেলে কথাটা মুছে দিন) বলে চিৎকার, কথিত মধ্যপন্থীদের প্রতি সমর্থন ওরা হোক বিদ্রোহী (যেমন সিরিয়ায়), কিংবা প্রেসিডেন্ট ও রাজা (যেমন মিসরের সিসি আর জর্ডানের আবদুল্লাহ; আমাদের বন্ধুদের (সৌদি, কাতারি, কুয়েতি) প্রতিও সমর্থন দিয়ে যাওয়া যাদের রাজা মারা গেলে পতাকা হবে অর্ধনমিত।


তবে আমরা তাদের সশস্ত্র করব। আপনি নিশ্চিত থাকুন। উপসাগরীয় দেশগুলো মার্কিন অস্ত্র, মিসাইল, ট্যাংক, বিমান গোগ্রাসে গিলবে। ট্রাম্প এসব ধূলিধূসরিত রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সফরে যাবেন। সেখানে তাকে একজন রাজার মতো মর্যাদা দেয়া হবে। আমার মনে হয়, তিনি এটা পছন্দ করেন। অপর দিকে, তিনি ইসরাইলকে নিশ্চয়তা দেবেন মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র গণতান্ত্রিক দেশটির প্রতি আমেরিকার অনন্ত, অব্যাহত, প্রশ্নাতীত সমর্থন দিয়ে যাওয়ার। এর সাথে অবশ্যই ট্রাম্প বলবেন আইএস-এর সন্ত্রাস, সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসের ব্যাপারে। ইতোমধ্যে ওবামা আইএসের মাজা ভেঙে দিতে পারেন ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ওঠার আগেই। তাহলে আইএস নিজের জন্য আর কোনো নাম বেছে নেবে বৈকি। ট্রাম্প ক্লান্ত মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের একটি মিথ্যা উক্তিকে সরিয়ে দিতে পারেন। মিথ্যাটা হলো ‘সর্বশক্তিমান ইসরাইল আর দখলীকৃত ফিলিস্তিনসমেত মধ্যপ্রাচ্যের পক্ষগুলো শান্তির লক্ষ্যে কঠিন সিদ্ধান্ত নেবে অবশ্যই।’


নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, ট্রাম্প তার প্রচারণার অংশ হিসেবে এই ছোট্ট ওয়াদাটা করবেন যে, ইসরাইলে মার্কিন দূতাবাস তেলআবিব থেকে জেরুসালেমে স্থানান্তরিত করা হবে। আজ এত বছর ধরে এ সংক্রান্ত ফাইল লকাররুমে পড়ে আছে যে, হোয়াইট হাউজের ‘পোলাপান’ সম্ভবত কয়েকটি ফাইল পুরনো বানিয়ে ফেলতে পারে যেগুলো সময়ের ধুলো জমে হলুদ হয়ে গেছে। এগুলোর বিষয় কেন হোয়াইট হাউজ আরবদের বিশেষত ফিলিস্তিনিদের চমক লাগিয়ে দেবে। যদি মার্কিন রাষ্ট্রদূত ‘পবিত্র নগরী’তে পৌঁছে যান, তখন ফিলিস্তিনিরা চাইবে জেরুসালেমে তাদের আধা রাজধানীতেও আমেরিকা দূতাবাস খুলুক। আমার সন্দেহ, ‘নিরাপত্তার শঙ্কা’র দরুন দূতাবাস সম্পর্কিত এই সামান্য প্রকল্পটি আরো কিছু দিন পেছনে ফেলে রাখা হবে।


তবুও কথা থেকে যায়। আমেরিকার নতুন প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব নিলে ‘তবুও’ কথাটা থাকবে সর্বদাই।


তাদের অনেকে আফসোস করেন মধ্যপ্রাচ্যের জন্য। তাদের হায়-হুতাশ আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়ার জন্য। তবে এসব জাতির প্রতি হোয়াইট হাউজের সমর্থন বেশি দেখা যায় না। দেখা যায় কি? এসব দেশ সত্যিই যদি পাশ্চাত্যের জন্য হুমকি হয়ে ওঠে, তখন ট্রাম্প কী করবেন? তিনি কি তার মুসলিমবিদ্বেষ ঝেড়ে ফেলবেন? নাকি দোস্ত পুতিনকে ফোন করবেন? তিনি কি একটা ম্যাপ বই চাইবেন?
তবে মনে রাখবেন, আমরা জর্জ ডব্লিউ বুশকে নিয়েও তেমন কথা বলতাম। এরপর আমরা পেলাম ইরাক। অবশ্য ট্রাম্পের সাধ্য নেই বুশের একই পথে চলার মতো।
অতএব, আমি নিষ্ঠুর এক পূর্বাভাস দেয়ার মতো ঝামেলায় পড়ছি। মধ্যপ্রাচ্য ট্রাম্পের কাছে পৌঁছে যাবে এবং তাকে আঁকড়ে ধরবে যা হবে তার জন্য প্রায় অপ্রত্যাশিত। তখন তাকে যুদ্ধ বা শান্তির মধ্যে একটি বেছে নেয়ার ভয়ানক কাজটি করতে হবে। তার প্রশাসন এই সঙ্কট মোকাবেলার সামর্থ্য রাখে না। সেটা অবশ্যই মার্কিন ভোটারদের দায়িত্বের বিষয়। ব্রিটেনের উঁচু ঘোড়ায় আমাদের চড়তে দেবেন না। বেশি দিন আগের নয়, এমন একজন মারাত্মক জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রীর কথা স্মরণ করবেন না? তিনি আফগানিস্তানে আটকে গেলেন। আটকে যাননি? এরপর ইরাকের বিপদ। নামটা কী যেন? টনি....।

ভাষান্তর : মীযানুল করীম


 

[X]