নিষিদ্ধ ভূখণ্ডে কয়েক দিন

Oct 09, 2016 08:45 am


বিশ্বের প্রায়-সব মুসলিম দেশের নাগরিকদের ইসরাইল ভ্রমণ নিষিদ্ধ। কিন্তু ইসরাইলে আছে মুসলমানদের প্রথম কেবলা মসজিদুল আকসা। তাই অনেক মুসলমানের কাছে জেরুসালেম তথা ইসরাইলের হাতছানি অপ্রতিরোধ্য। সেই হাতছানিতে সাড়া দিয়ে কানাডায় অভিবাসী পাকিস্তানি শেরাজ খান ক’দিন কাটিয়ে আসেন দেশটিতে। ঐশী পূর্ণতা’র ভাষান্তরে সেই অচেনা দেশের পথে-প্রান্তরে ঘোরার নিরাভরণ বর্ণনা

 


কানাডায় অভিবাসী হওয়ার পর আমার সবচেয়ে বড় বাসনাটি ছিল, কানাডিয়ান পাসপোর্ট নিয়ে আমি সর্বপ্রথম যে দেশটি সফর করতে চাইব, সেটি হবে ইসরাইল। কারণ, পরিচিত মানুষজন ও বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে ওই পবিত্র ভূমির এতই গল্প শুনেছি যে, আমার উত্তেজনা আর বাঁধ মানছিল না। তবে পাশাপাশি অনেক ভয়ও করছিল। কারণ, পাকিস্তানি অথবা মুসলিম অথবা দুটোই হওয়ার ‘অপরাধে’ অনেক পর্যটককে নাকি বিমানবন্দর থেকেই পত্রপাঠ বিদায় দিয়েছে ইসরাইলি কাস্টমস।
মনে মনে অনেক দোয়া-দরুদ পড়ে আর মাথাভর্তি চেনাজানা লোকদের উপদেশের বোঝা নিয়ে ২০১৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ইসরাইল-অভিমুখী ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে চড়ে বসলাম। স্থানীয় সময় ভোর ৫টায় আমাদের বিমান বেন গুরিয়ন এয়ারপোর্টে অবতরণ করল।

এবার শুরু হলো ইসরাইলি কাস্টমসের বহুশ্রুত হ্যাপা। একজন কাস্টমস কর্তা ভারী গলায় আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলেন : ইসরাইলে চেনাজানা কেউ আছে? আরবি বলতে পারেন? আগে কখনো মিডল ইস্ট এসেছেন? ইত্যাদি।
এসব প্রশ্নমালা শেষে কর্তাবাবু একটু থামলেন। তারপর আমার পাকিস্তানি পাসপোর্ট দেখতে চাইলেন। কিন্তু পাকিস্তানি পাসপোর্ট আমি পাবো কোথায়? আমি তো এখন কানাডার নাগরিক।


এবার তিনি আমার কানাডিয়ান পাসপোর্টটি নিয়ে নিলেন আর একটি ওয়েটিং এরিয়া দেখিয়ে ওখানে অপেক্ষা করতে বললেন। এ রকম একটা পরিস্থিতিতে পড়তে হবে এমনটি আমি আগেই ধারণা করেছিলাম। তাই সাথে এনেছিলাম ইসরাইল ভ্রমণ গাইড। ওয়েটিং এরিয়ায় বসে ওটাই পড়তে শুরু করলাম।


মিনিট তিরিশেক পর এলেন কাস্টমসের আরেক কর্তাবাবু। তিনি এসে আমাকে আরেক রুমে নিয়ে গেলেন। আবার শুরু হলো জিজ্ঞাসাবাদ : ইসরাইল কেন এসেছ, এত দেশ থাকতে ইসরাইলে ভ্রমণ করতে চাচ্ছ কেন? ইত্যাদি। ভদ্রলোক আমার জবাব শোনেন আর খুব ধীরে ধীরে, যেন অনেক কষ্ট হচ্ছে তার, এভাবে কম্পিউটারে সেগুলো টাইপ করে নেন।
সব কাজ শেষে এবার নতুন প্রশ্ন, কেন আমি কানাডায় অভিবাসী হলাম, সেখানে আমি কী করি। শুনেটুনে ভদ্রলোক আমার হাতে একটি কাগজ দিয়ে ওতে আমার পুরো নাম ও ই-মেইল অ্যাড্রেস লিখে দিতে বললেন। দিলে তিনি আমাকে আবার সেই ওয়েটিং এরিয়ায় অপেক্ষা করতে বললেন।


আমি অপেক্ষা করতে থাকলাম। এক ঘণ্টা পর এবার এক তরুণী কর্মকর্তা আমায় ডেকে নিলেন আরেকটি রুমে। রুমের দেয়ালে জেরুসালেমের ডোম অব রকের ছবি ঝোলানো, আর আছে ইসরাইলি পতাকা। শুরু হলো নতুন প্রশ্নোত্তর পর্ব।
এই পর্বটি চলল ৪৫ মিনিট। সবশেষে তরুণী কর্মকর্তা জানালেন যে আমার দেয়া সব তথ্য ঠিক কি না তা তিনি যাচাই করে দেখবেন। অতএব আবার অপেক্ষা।
আমার ইসরাইল পৌঁছার চার ঘণ্টার মাথায় এক ভদ্রমহিলা এলেন। তার হাতে আমার পাসপোর্ট। তিনি আলাদা একটি কাগজে আমাকে এন্ট্রি ভিসা দিলেন এবং লাগেজ মেশিনের কাছে গিয়ে লাগেজ সংগ্রহ করতে বললেন। আমি আমার জিনিসপত্র হাতে নিয়েই বাবার কাছে ফোন করলাম। জানালাম, অবশেষে আমি জেরুসালেম পৌঁছাতে পেরেছি!


তেল আবিব থেকে পবিত্র নগরী জেরুসালেম গাড়িতে ৪৫ মিনিটের পথ। মুসলিম, খ্রিষ্টান ও ইহুদি তিন ধর্মের অনুসারীদের কাছেই এই নগরী পবিত্র। এই নগরীতে মুসলিম, খ্রিষ্টান, ইহুদি ও আর্মেনীয়রা আলাদা-আলাদা অংশে বাস করে।
আমার হোটেলটি পুরনো জেরুসালেমে। সেখানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে আমার দুপুর হয়ে গেল। কিন্তু আমার হাতে নষ্ট করার মতো সময় নেই। তাই ঝোলাঝুলি রুমে ফেলেই ছুটলাম পবিত্র আল-আকসা মসজিদের দিকে।
জাফা গেট (দেয়াল দিয়ে নানা ভাগে বিভক্ত শহরের অনেক গেটের একটি) থেকে আল-আকসা মসজিদে যাওয়ার যে পথটি, তার দু’পাশে প্রাচীন শহরটির ঐতিহ্যবাহী বাজার বসেছে। ভারি সুন্দর দেখতে।
আল-আকসা মসজিদের গেটে পৌঁছাতেই প্রহরীরা আমাকে আটকালো। তারা প্রথমে আমার পাসপোর্ট দেখতে চাইল। পরে আমি আসলেই মুসলিম কি না পরীক্ষা করার জন্য সুরা ফাতিহা তেলাওয়াত করতে বলল। আমি ‘পরীক্ষায়’ পাস করলাম এবং মসজিদে ঢোকার অনুমতি পেলাম।

পবিত্র আল-আকসা মসজিদের ভেতরটা বেশ সুপরিসর আর সাদামাটা সুন্দর। ভেতরে দেখলাম মুসল্লিতে ভরা। আমি প্রথমে এদিক-ওদিক দেখে নিয়ে নামাজ আদায় করে নিলাম।
আল-আকসা মসজিদের উল্টো দিকেই সোনালি আচ্ছাদনযুক্ত ডোম অব রক। এই চমৎকার স্থাপনাটি সম্বন্ধে কথিত আছে যে, পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ছবি তোলা হয়েছে এমন স্থাপনার মধ্যে এর স্থান সবার ওপরে। চকচকে স্বর্ণালি আভাযুক্ত সৌধটি দাঁড়িয়ে আছে বিবর্ণ আকাশে হেলান দিয়ে।
ডোম অব রক সম্পর্কে কথিত আছে, মহানবী সা. পবিত্র মিরাজে যাওয়ার জন্য এর দরজা থেকেই বোরাকে আরোহণ করেছিলেন। আমি সম্মোহিতের মতো সেই স্থানটির দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম। এক অপূর্ব, অব্যক্ত ভাবানুভূতিতে আমার সমস্ত হৃদয়মন ছেয়ে গেল। যেখান থেকে আমাদের প্রিয়তম নবী সা. মিরাজ সফর শুরু করেছিলেন, আমি ঠিক সেখানটায় দাঁড়িয়ে! ভাবতেই কেমন যেন আচ্ছন্ন বোধ করছিলাম।
জেরুসালেমের পশ্চিম দেয়ালে ইহুদিদের উপাসনা করার অনুমতি রয়েছে। এবার আমি সেদিকে গেলাম। দেখলাম, পুরনো চুনাপাথরের দেয়াল ধরে দাঁড়িয়ে কেঁদে-কেঁদে প্রার্থনা করছে একদল ইহুদি। এটি ইহুদিদের কাছে সবচেয়ে পবিত্র স্থান।
ওখান থেকে আমি গেলাম খ্রিষ্টানদের ‘পবিত্র সমাধি গির্জা’য়। খ্রিষ্টানদের বিশ্বাস, যিশুর সমাধি এখানেই অবস্থিত এবং এখান থেকেই তিনি পুনরুত্থিত হবেন।
দিনের আলো নরম হয়ে আসতেই আমার মনের ভেতরটাও একধরনের শান্ত-সমাহিত হয়ে এলো। তিন ধর্মের বিশ্বাসী মানুষজন দেখতে দেখতে একধরনের প্রশান্তি ঘিরে ধরল আমাকে।

এখানে-ওখানে ঘুরে-ফিরে জেরুসালেমে তিন দিন কাটিয়ে দিলাম। এ সময় আমি সঙ্গী হিসেবে পেয়ে যাই এক ভারতীয় পর্যটককে। হোটেলেই তার সাথে আমার পরিচয়। আমরা দু’জন ঠিক করি, এবার বেথলেহেম ও হেবরন যাবো।
বেথলেহেম এলাকাটি জেরুসালেমের দক্ষিণ দিকে। গাড়িতে গেলে ৩০ মিনিটের মতো লাগে। প্যালেস্টাইনি অধ্যুষিত এই শহরটি যিশুখ্রিষ্টের জন্মস্থান হিসেবে পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়। এখানে আছে যিশুর জন্মমন্দির।


বেথলেহেমে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে আমরা চললাম হেবরনের দিকে। প্যালেস্টাইন কর্তৃপক্ষ ও ইসরাইল সরকার দু’পক্ষেরই কর্তৃত্ব চলে এখানে। প্যালেস্টাইন দেখে বেসামরিক দিক আর ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে সামরিক দিক। তবে এ শহরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বস্তু হলো কেভ অব দ্য প্যাট্রিয়ার্কস। এখানে আছে হজরত ইব্রাহিম আ. ও হযরত ইসহাক আ. এবং তাদের স্ত্রীদের মাজার শরীফ। এলাকাটিকে মুসলমান, খ্রিষ্টান ও ইহুদি তিন সম্প্রদায়ই পবিত্রজ্ঞান করে।
দু’টি সিকিউরিটি চেকপয়েন্ট পার হয়ে সমাধিস্থলের মুসলিমদের জন্য নির্ধারিত অংশে পৌঁছলাম। বিশ্বের তিন প্রধান ধর্মের অনুসারীদের শ্রদ্ধেয় নবীগণের রওজায় আমি, ভাবতেই কেমন যেন এক অনাস্বাদিত আধ্যাত্মিক চেতনায় সারা শরীর শিউরে উঠল।
এখানে দেখা হয়ে গেল এক কানাডিয়ান পর্যটকের সাথে; যদিও লিথুয়ানিয়ায় হোস্টেলেই তার সাথে আমার পরিচয়। এবার আমরা ঠিক করলাম, রামাল্লা যাবো।
রামাল্লা পশ্চিম তীরের একটি প্যালেস্টাইনি শহর। জেরুসালেম থেকে গাড়িতে ৩৫ মিনিটের পথ। ঠিক হলো, রামাল্লায় আমরা এক রাত কাটাবো।
রামাল্লার যে হোস্টেলে আমরা রাত কাটাবো বলে ঠিক করেছি, সেটি বাস স্টেশন থেকে এক মিনিটের পথ। আমরা হোস্টেলে ঢুকেই জিনিসপত্র রেখে বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের হাতে অপচয় করার মতো সময় নেই।
রামাল্লা ভারি প্রাণবন্ত একটি প্যালেস্টাইনি শহর। এই শহরেই আছে ফিলিস্তিনের মরহুম নেতা ইয়াসির আরাফাতের সমাধি।
আমরা উদ্দেশ্যবিহীনভাবে কয়েকটি স্থানীয় বাজার ঘুরেফিরে দেখলাম। গেলাম একটি জাদুঘরেও। এরপর জনপ্রিয় বালান্দা ক্যাফেতে শিশায় ধূমপান করলাম। শিশায় ধূমপান আমি আগেও করেছি, কিন্তু এবারেরটি বেনজির।
আমাদের সৌভাগ্য বলতে হবে, ঘুরতে ঘুরতে আমাদের কিছু স্থানীয় বন্ধু জুটে গেল। কেউ চিন্তাই করতে পারবে না, এরা কত সাধারণ জীবনযাপন করে। সত্যি বলতে কি, রামাল্লা শহরে আমি যত দামি গাড়ি দেখেছি, ইসরাইলের কোথাও তেমনটা দেখিনি। তবে স্থানীয় বন্ধুরা বলল, রামাল্লা থেকে গাড়িতে ১৫ মিনিট পথ অতিক্রম করলেই আছে অনেকগুলো শরণার্থী শিবির, যেখানে অসংখ্য প্যালেস্টাইনি চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে।
পরদিন গেলাম নাবলুস শহরে। বাসে যেতেই লাগল এক ঘণ্টার বেশি। একসময় প্যালেস্টাইনি জনতা ও ইসরাইলি সৈন্যদের সংঘর্ষে রামাল্লা ও নাবলুস দুই শহরই রণক্ষেত্রে পরিণত হতো।
নাবলুস শহরে আমি ছিলাম কয়েক ঘণ্টার মতো। এই স্বল্প সময়েই শহরটিকে আমার কর্মব্যস্ত ও প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর মনে হয়েছে। এ সময় বাজারে উদ্দেশ্যবিহীন হাঁটতে হাঁটতে আরব দুনিয়ার অত্যন্ত জনপ্রিয় ডেসার্ট কুনাফেহর স্বাদ নিলাম। এটি একধরনের পনির পেস্ট্রি, যা মিষ্টি ও চিনির সিরায় ভেজানো। সত্যি বলতে কি, ইসরাইলে আসার পর এত সুস্বাদু জিনিস আমি আর খাইনি।
এরপর গেলাম হাম্মাদ আল শিফা নামে একটি হামামে (স্নানাগার)। সেখানে গোসল করে শুধু শরীর নয়, মনটাও যেন পবিত্র হলো।
নাবলুস শহরটি অলিভ অয়েল সাবানের জন্য বিখ্যাত। আমার ভারি কৌতূহল হলো জিনিসটা কেমন দেখার। কিন্তু অনেক কারখানা ঘুরেও পেলাম না। দুপুরের পর এসব কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। তবে ছোট একটি দোকানে আমি কয়েকটি অলিভ অয়েল ও সাবান পেয়ে গেলাম। ভালো লাগল না। মনে হলো, ঠকলাম।
আমার শহর ছাড়ার সময় হয়ে এলো। একটি বাসে করে এলাম প্রথমে রামাল্লায়, সেখান থেকে আরেক বাসে করে জেরুসালেম এবং তারপর তেল আবিব। সেখানেই আমার স্বল্পকালীন ভ্রমণের শেষ দিনটি কাটালাম।
ওই দিন আমি গেলাম তেল আবিবের পুরনো অংশের জাফা এলাকায়। এলাকাটি মুসলিম অধ্যুষিত। এখানে খেলাম টুনা পিজা। অপূর্ব তার স্বাদ। কিনলাম কিছু স্মারক আর পুরনো জাফা সৈকতে ভূমধ্যসাগরীয় সূর্যের চমৎকার কিরণ কিছু নিলাম শরীরে মেখে।
দিনটি ছিল শুক্রবার। ইহুদিদের বিশ্রাম দিবস। সন্ধ্যা হতে-না-হতেই রাস্তাঘাট ফাঁকা হতে শুরু করল। পরদিন পবিত্র ভূখণ্ড ছেড়ে ফিরে চললাম কানাডার উদ্দেশে।


 

[X]