‘ইয়েস, উচ্চাভিলাষী বাট অতি উচ্চাভিলাষী’!

Jun 19, 2016 07:02 am


সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু


‘ইয়েস, উচ্চাভিলাষী’ কথাটি বলেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। গত ২ জুন জাতীয় সংসদে ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে বাজেট পেশ করে তার পরের দিন বাজেটোত্তর এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন। তার মন্তব্যের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এবারের বাজেটে রাজস্ব আয়ের যে টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছে, তার ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন এই টার্গেটটি কী আসলে উচ্চাভিলাষী, নাকি আরো কিছু। যদি তাই হয়, তবে অর্থমন্ত্রীর কথাটি একটু বাড়িয়ে বলা যায় ইয়েস উচ্চাভিলাষী, বাট অতি উচ্চাভিলাষী!


এখানে শেষ নয়, এবারকার বাজেটে যে রাজস্ব আয়ের টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছে তার জন্য সাধারণ মানুষের ঘাড়ে অতিরিক্ত করের বোঝা চাপবে ৫২ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বাজেটে এই পরিমাণ অর্থ আদায় করার জন্য ভ্যাটের আওতা বাড়ানো হয়েছে ব্যাপক হারে। পণ্যের ক্ষেত্রে এমন কোনো জায়গা খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে ভ্যাট আরোপ করা হয়নি। আগামী অর্থবছরে জনগণকে আরো কর দিতে হবে এটি অনেকটা সুনিশ্চিত।


২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের মোট আকার বা ব্যয়ের পরিমাণ ধরা হয়েছে তিন লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। এটা জিডিপির ১৭ দশমিক ২ শতাংশ। এই বাজেট চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের চেয়ে ৪৫ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা এবং সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ৭৬ হাজার ৪০ কোটি টাকা বেশি। চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মূল বাজেটের আকার ছিল দুই লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা।

 

প্রতিদিন আদায় করতে হবে ৫৫৭ কোটি টাকা!
বাজেটে মোট রাজস্বপ্রাপ্তি ধরা হয়েছে দুই লাখ ৪২ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা। এর মধ্যে কর খাত থেকে আসবে দুই লাখ ১০ হাজার ৪০২ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক অনুদান থেকে পাওয়া যাবে বাকি পাঁচ হাজার ৫১৬ কোটি টাকা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য প্রাক্কলন করা হয়েছে দুই লাখ তিন হাজার ১৫২ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে (২০১৫-১৬) এ খাত থেকে আয়ের টার্গেট ছিল এক লাখ ৭৬ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা; তবে রাজস্ব আদায়ের ব্যর্থতার কারণে সংশোধিত বাজেটে তা কেটে কমানো হয়েছে দেড় লাখ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে সংশোধিত বাজেট থেকে রাজস্ব আদায় বেশি করতে হবে ৫৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি, যা সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ৩৫ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। এই অর্থ কর আদায়ের মাধ্যমে জনগণের কাছ থেকে আদায় করতে হবে।
আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের যে টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছে তা যদি অর্জন করতে হয় তবে এনবিআরকে গড়ে প্রতিদিন ৫৫৬ কোটি ৫৮ লাখ টাকা রাজস্ব আয় করতে হবে। এটি অনেকটা অসম্ভব বলা যেতে পারে। অর্থমন্ত্রীও তার বাজেট বক্তৃতায় এই টার্গেটকে বলেছেন ‘উচ্চাভিলাষী’।


এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বলেছে, এ বাজেট বাস্তবায়ন করতে হলে ৮০ হাজার কোটি টাকার বাড়তি বিনিয়োগ লাগবে। সরকারকে বাড়তি প্রায় সাড়ে ৬৫ হাজার কোটি টাকা আয় বাড়াতে হবে। আর সরকারকে বাড়তি ব্যয় করতে হবে প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকা। এ তিনটি অর্জন করা গেলে ঘোষিত বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।
সিপিডির পক্ষ থেকে আরো বলা হয়েছে, এবার বাজেট ঘাটতি ৫ শতাংশ ধরা হয়েছে। এর ৬৮ শতাংশই অভ্যন্তরীণ ঋণ দিয়ে পূরণ করা হবে। গত বছর এই ঋণ এসেছে সঞ্চয়পত্র বিক্রির মাধ্যমে। যা সুদ পরিশোধের ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। পাইপলাইনে থাকা বৈদেশিক সাহায্য ব্যবহারের মাধ্যমে এই ঘাটতি পূরণের কোনো উদ্যোগ আমরা দেখি না। এখানে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে পূরণ করা হলে আগামীতে ঋণ পরিশোধে ব্যয় অত্যধিক বেড়ে যাবে। এ ছাড়া বাংলাদেশে যেখানে কখনো বছরে ৩০০ কোটি ডলারের চেয়ে বেশি বৈদেশিক সাহায্য ব্যবহার হয়নি, সেখানে কিভাবে রাতারাতি ৬০০ কোটি ডলারের বৈদেশিক বিনিয়োগ ব্যবহার করা হবে, সে প্রশ্নও তোলেন সিপিডির সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।


তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা মো: আজিজুল ইসলাম প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, নতুন বাজেট বাস্তবতার সাথে কোনো সম্পৃক্ত নয়। যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, তা বাস্তবতার সাথে মিল নেই। রাজস্ব আয়ের বিশেষ করে এনবিআর খাতে যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, তা অর্জন করা সম্ভব হবে না। চলতি অর্থবছরেও তারা তাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় এনবিআর খাতে যে লক্ষ্যমাত্রা ধরেছেন, সেটাকে নিজেই উচ্চাভিলাষী বলে আখ্যায়িত করেছেন। তবে অতি উচ্চাভিলাষী হওয়া ভালো না। ফলে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব না হলে সরকারকে অবশ্যই অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে বাজেট বাস্তবায়নে ঋণের প্রতি নজর দিতে হবে।


তিনি বলেন, আগামী অর্থবছর জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ২ শতাংশ ধরা হয়েছে তা অর্জন করা সম্ভব হবে না। কারণ সেটা অর্জন করতে হলে যে পরিমাণ বিনিয়োগ দরকার হবে তা হবে না। এডিপি বাস্তবায়নের গতি, মান ও অর্থ ব্যয়ের সক্ষমতা দরকার সেটা আমাদের নেই। তিনি বলেন, বৈদেশিক সহায়তার জন্য যে অর্থ ধরা হয়েছে তা অর্জন করা কঠিন হবে।

 

লাখ কোটি টাকার ঘাটতি
প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ঘাটতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ৯৭ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকা। এটা জিডিপির ৫ শতাংশ। অবশ্য আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলে ঘাটতি আরো বেড়ে যাবে। বিদায়ী অর্থবছরের মূল বাজেটে মোট ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৮৬ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে ঘাটতি ৫০৮ কোটি টাকা বেড়েছে।


বাজেট ঘাটতি মূলত পূরণ করা হবে অভ্যন্তরীণ ব্যাংকব্যবস্থা ও সঞ্চয়পত্র এবং বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণ বাবদ ৩৮ হাজার ৯৪৭ কোটি টাকা (চলতি অর্থবছরে এ খাতে ছিল ৩২ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা), বৈদেশিক অনুদান বাবদ পাঁচ হাজার ৫১৬ কোটি টাকা (চলতি অর্থবছরে এ খাতে ছিল ৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকা), ব্যাংকিং খাত থেকে ৩৮ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা (চলতি অর্থবছরে এ খাতে ছিল ৩৮ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা) ও ব্যাংকবহির্ভূত খাত থেকে ২২ হাজার ৬১০ কোটি টাকা (চলতি অর্থবছরে এ খাতে ছিল ১৮ হাজার কোটি টাকা) নেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে বাজেটে।


ব্যাংকবহির্ভূত খাতের মধ্যে সঞ্চয়পত্র খাত থেকে ১৯ হাজার ৬১০ কোটি টাকা (চলতি অর্থবছরে এ খাতে ছিল ১৫ হাজার কোটি টাকা) ও অন্যান্য খাত থেকে তিন হাজার কোটি টাকা (চলতি অর্থবছরে এ খাতে ছিল তিন হাজার কোটি টাকা) নেয়া হবে। সংশোধিত বাজেটে সঞ্চয়পত্র খাত থেকে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা অধিক ঋণ নেয়া হয়েছে।


অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় বিনিয়োগ নিয়ে এক ধরনের ধোঁয়াশা সৃষ্টি করেছেন। দেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে সঠিক কোনো পরিসংখ্যান তিনি দিতে পারেননি। তিনি ধারণা করছেন, ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বাড়ছে। বাজেট বক্তৃতায় বলা হয়েছে, ‘চলতি অর্থবছরের শুরুতে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগে কিছুটা স্থবিরতা ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক তথ্য-উপাত্ত থেকে দেখা যায়, ব্যক্তি খাতে ঋণপ্রবাহ, আমদানি-রফতানি, মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি, ঋণপত্র খোলা ও নিষ্পত্তি এবং সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ অনেকখানি বেড়েছে। এটি ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির ইঙ্গিত বহন করছে। এ ছাড়া, রাজনৈতিক ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানি-পরিবহনসহ ভৌত অবকাঠামো খাত উন্নয়নে আমাদের চলমান উদ্যোগ ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ ক্রমশ ত্বরান্বিত করছে বলে আমার মনে হয়।’


অর্থমন্ত্রী বলেছেন, বর্তমানে অর্থায়নের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ উৎস, বিশেষ করে সঞ্চয়পত্রের দিকে আমরা কিছুটা ঝুঁকে পড়েছি। এরূপ চলতে থাকলে সুদ বাবদ ব্যয় বেড়ে উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই অভ্যন্তরীণ ব্যয়বহুল অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পাইপলাইনে থাকা বিদেশী সহায়তার ব্যবহার বৃদ্ধির বিষয়ে সচেষ্ট হতে হবে। একই সাথে সহজ শর্তের বহুপাক্ষিক ঋণ গ্রহণে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।’


আগামী অর্থবছরে বাজেটকে এককথায় বলা যেতে পারে, এটি শুধু উচ্চাভিলাষীই নয়, অতি উচ্চাভিলাষী এবং যা বাস্তবায়ন করা অসম্ভব। বিশেষ করে রাজস্ব টার্গেট অর্জন করা যাবে তা এখনি বলা যেতে পারে।


 

[X]