কূটনীতিতে স্বস্তি রাজনীতিতে অস্বস্তি

Jun 18, 2016 06:24 am


জাকির হোসেন লিটন


দেশী-বিদেশী নানা চাপ উপেক্ষা করে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বিতর্কিত ‘একতরফা’ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এলেও সরকারের সাথে আন্তর্জাতিক মহলের কূটনৈতিক সম্পর্ক অনেকটাই স্থিতিশীল রয়েছে। একটি অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচন, বিরোধী জোটের ওপর দমন-পীড়ন, যুদ্ধাপরাধের বিচার ইস্যু, আর্থিক কেলেঙ্কারি, বিতর্কিত স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতিতে বৈশ্বিক সম্প্রদায় খানিকটা সোচ্চার হলেও সরাসরি কোনো হস্তক্ষেপ নেই তাদের। বিশেষ করে ভারত ও রাশিয়া সরকারের সব কর্মকাণ্ডকে পুরোপুরিভাবে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহার ইস্যুটি ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো তাদের কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চালিয়ে যাচ্ছে। এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্র চীন সরকারের নানা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অংশীদারিত্ব বজায় রেখেছে। পাশে রয়েছে জাপানও। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে বিশ্বের প্রভাবশালী অনেক নেতার সাথেই দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বুলগেরিয়া সফর করে ইউরোপের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা ছিল তার। সব শেষে নানা জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে সৌদি আরব সফরের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপনের লক্ষ্য ছিল তার। প্রধানমন্ত্রীর সৌদি আরব সফরকে সরকার সাফল্য হিসেবে দেখছে।


যদিও এই সফরে সৌদি আরব বেশি লাভবান হয়েছে। সৌদি সামরিক জোটে অংশ নেয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের সম্মতি, জাতিসঙ্ঘে সৌদি-বিরোধী একটি অবস্থানে সরাসরি বাংলাদেশ হস্তক্ষেপ করেছে। অপর দিকে বাংলাদেশ থেকে দক্ষ জনশক্তি নেয়ার ব্যাপারে সরকারের আগ্রহ এবং বাংলাদেশে সৌদি বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরে বেশ কিছু চুক্তি স্বাক্ষরের কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। তারপরও দীর্ঘ দিন পর প্রধানমন্ত্রী সৌদি আরব সফর ও সৌদি বাদশাহর সাথে মিলিত হলেন। বহির্বিশ্বের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষায় সরকার অনেকটাই দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছে বলে মনে করছে নীতিনির্ধারকেরা। এ ছাড়া নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও পদ্মা সেতুসহ দেশের মেগা প্রকল্পগুলোর দৃশ্যমান অগ্রগতিতে সরকারের শীর্ষ নেতৃত্ব অনেকটাই স্বস্তিতে রয়েছেন।


বৈদেশিক বিষয়ে খানিকটা স্বস্তির মধ্যে থাকলেও দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সরকারের জন্য উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বিরোধী রাজনীতি না থাকা সত্ত্বেও দেশে অস্থিরতা বিরাজ করছে। চার দিকে অস্বস্তি। অনিশ্চয়তায় রয়েছে দেশের অর্থনৈতিক সেক্টর। বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা লুটের ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে দুনিয়ায়। ফিলিপাইনে তদন্ত চলছে দ্রুতগতিতে। তবে বাংলাদেশে সে তুলনায় আওয়াজ ক্ষীণ। অথচ টাকা এই দেশের জনগণের। সংখ্যাটি বলা হচ্ছে বাংলাদেশী টাকায় ৮০০ কোটি। বিস্ময়কর হলেও সত্য, এ খবর বাংলাদেশের মানুষ প্রথম জেনেছে ফিলিপাইনের সংবাদমাধ্যম থেকে। এর আগে এ ব্যাপারে মুখ খোলেনি বাংলাদেশের জাতীয় আমানতের প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থমন্ত্রী নিজেও ব্যাংক লুটের ঘটনাকে সাগর চুরি হসেবে উল্লেখ করেছেন। এটিএম কার্ডে জালিয়াতির পর বাংলাদেশ ব্যাংকে এত বড় কেলেঙ্কারি পুরো অর্থনৈতিক সেক্টরেই অবিশ্বাস সৃষ্টি করেছে।


সুপ্রিম কোর্ট আর প্রধান বিচারপতির সাথে নানা ইস্যুতে দূরত্ব বাড়ছে। রাষ্ট্রের নানা অঙ্গের মধ্যে এক ধরনের সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।


আরো কিছু কিছু ক্ষেত্রেও অস্বস্তিকর খবর পাওয়া যাচ্ছে। মালয়েশিয়া একতরফাভাবে বাংলাদেশ থেকে ১৫ লাখ শ্রমিক নেয়ার চুক্তি বাতিল করে দিয়েছে। কয়েকটি প্রভাবশালী দেশ বাংলাদেশের নাগরিকদের ভিসা দেয়ার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে ভিসা দেয়া হয়নি বলেও নানা সূত্রে জানা যাচ্ছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ নতুন করে কোনো সঙ্কটের দিকে এগোচ্ছে কি না সে প্রশ্ন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।


যুদ্ধাপরাধের বিচার ইস্যুতে বহির্বিশ্বে অনেক রাষ্ট্রের সমালোচনার মুখে পড়ে সরকার। এ বিচারকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের সাথে বরাবরই সম্পর্ক খুব শীতল যাচ্ছিল। বিশেষ করে বিচারকে কেন্দ্র করে তুরষ্ক বাংলাদেশ থেকে তাদের রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করে নেয়ার খবরটি সরকারের জন্য খানিকটা উদ্বেগজনক।


সম্প্রতি বাংলাদেশে ইসরাইলি তৎপরতার খবর বেশ আলোচিত হয়। সরকারের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে বসে বিএনপির একজন নেতার সাথে ইসরাইলের এক নেতার সাক্ষাৎকে কেন্দ্র করে মাঠ গরম করতে শুরু করেন সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। এ ইস্যুতে বিএনপির ওই নেতাকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয়ার সাথে সাথে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয় ইসরাইলের ওই নেতা এর আগে প্রধানমন্ত্রী পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের সাথেও বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন। এ খবরে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। এ ছাড়া ভারতের মতো দেশে বসে আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্র হচ্ছে এ খবরে ভারতেও কিছুটা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, যা আওয়ামী লীগের জন্যই অস্বস্তিকর।


কিছুদিন আগে কয়েক ধাপে হয়ে যাওয়া এ যাবৎকালের সহিংস ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সরকারকে বেশ চাপের মুখে ফেলেছে। প্রথমবারের মতো দলীয়ভাবে নির্বাচন আয়োজন করায় প্রার্থীসহ শতাধিক লোকের প্রাণহানি ঘটে কলঙ্কিত এ নির্বাচনে। নিহতদের প্রায় সবাই ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী। এর জন্য নির্বাচন পর্যবেক্ষকসহ বিশ্লেষকেরা সরকারকেই দায়ী করেন। যদিও কেউ কেউ আবার নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতাকেই দায়ী করে থাকেন সহিংসতার জন্য। তবে সহিংসতার জন্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনের একই রকম ব্যাখ্যা সরকারের নীতিনির্ধারকদের আরো বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে। এর মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন যে সরকারের নিয়ন্ত্রণে এবং সরকারের ভাষাই নির্বাচন কমিশনের ভাষা সেটি প্রমাণ হয়ে গেছে বলে দাবি সমালোচকদের।


তবে সবকিছু ছাপিয়ে দেশ-বিদেশে চরম অস্বস্তির খবর হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি। বিশেষ করে একের পর এক হিন্দু পুরোহিত ও খ্রিষ্টান যাজকসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকদের হত্যা, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের হত্যার হুমকি, বিদেশী নাগরিক হত্যা এবং সম্প্রতি পুলিশের এসপির স্ত্রীকে নৃশংসভাবে হত্যাসহ একাধিক টার্গেট কিলিং এবং হত্যাকাণ্ডের পর সারা দেশে যৌথ অভিযানের নামে রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের হয়রানির বিষয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে সরকার। এসব হত্যাকাণ্ডের অনেকগুলোর দায় স্বীকার করে নিয়েছে আন্তর্জাতিক চরমপন্থী জঙ্গি গোষ্ঠী আইএস। যদিও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বারবার সতর্কতার পরও সরকার আইএসের অস্তিত্বকে বরাবরই অস্বীকার করে আসছে। তবে দেশে যে জঙ্গি গোষ্ঠীরা তৎপর রয়েছে তা নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনসহ প্রকাশ্যেই ঘোষণা দিচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিরা। আর সরকারের স্বীকারোক্তির এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও বাংলাদেশ নিয়ে তাদের আশঙ্কা প্রকাশ করে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠীর আস্তানা হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশ এমন ভবিষ্যদ্বাণীও করে যাচ্ছে প্রভাবশালী কোনো কোনো দেশ। তবে গুম, খুন ও টার্গেট কিলিংসহ বিভিন্ন গুপ্তহত্যার জন্য সরকার বিরোধী জোট বিএনপি ও জামায়াতকেই বারবার দায়ী করে যাচ্ছে। এতে আসল অপরাধীরা পার পেয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। শুধু তাই নয়, সাম্প্রতিক এসব ঘটনা সরকারকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই দেখছেন সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। যার পেছনে বিদেশী প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো জড়িত আছে বলে দাবি করছেন সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা। সবকিছুর মধ্যে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আবিষ্কার এবং পরাশক্তি বা আঞ্চলিক শক্তিধর কয়েকটি দেশকে এভাবে দোষারোপ সরকারের ভেতরের অস্থিরতার বহিঃপ্রকাশ।


এই অস্থিরতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে সরকারের ঘনিষ্ঠ সাম্প্রদায়িক সংগঠন হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান পরিষদের কার্যক্রম সংগঠনটি দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। তাদের এ ধরনের দাবি স্পষ্টত রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। অপরদিকে বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনও এসব ঘটনায় তৎপর হয়ে উঠেছে। হিন্দু পুরোহিত হত্যার পর হাইকমিশন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গেছেন। কিন্তু আইএসের নামে বিদেশি নাগরিক, যাজক বা ভিন্ন মতাবলম্বীরা নিহত হলেও তারা এ ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখাননি। হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ এ ভারতীয় হাইকমিশনের এসব তৎপরতা সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। সরকারকে শেষ পর্যন্ত বলতে হয়েছে সংখ্যালঘু নির্যাতনে বা হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নিয়ন্ত্রণে কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের সহায়তার প্রয়োজন নেই।


এমন পরিস্থিতির মধ্যে আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক জন প্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম জোটের শরিক জাসদের বিরুদ্ধে কঠোর মন্তব্য করছেন। তিনি বলেছেন জাসদের মন্ত্রী করার জন্য প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যার ক্ষেত্র প্রস্তুত করার জন্য জাসদকে দায়ী করেন। ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের জাসদের মতো প্রতিক্রিয়াশীল দলের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সতর্ক থাকতে বলেন। আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদকের এই বক্তব্য আওয়ামীলীগ ও ১৪ দলীয় জোটের মধ্যে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি করছে। অনেকে মনে করেন বিশেষ কোনো লক্ষ্য নিয়ে সৈয়দ আশরাফ এমন মন্তব্য করেছেন। যার প্রভাব আগামী দিনের রাজনীতিতে আরো স্পষ্ট হবে।


 

[X]